বিল্ডিং ডিজাইন নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে একটি ভ্রান্ত ধারণা

বিল্ডিং ডিজাইন নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে একটি
ভ্রান্ত ধারণা রয়েছে। 
এখনো অনেকে
মনে করেন বিল্ডিং ডিজাইন মূলত স্থাপত্য নকশা
(Architechtural plan)। একজন স্থপতিকে দিয়ে
এই নকশা করিয়ে নেওয়াটাই হলো ডিজাইন। বাকি
কাজটা সম্পূর্ণ নির্মাণ শ্রমিকদের। এটা সম্পূর্ণ
আত্মঘাতী একটা ধারণা।
একজন স্থপতি যেটি করেন সেটি হলো
বিল্ডিংয়ের নকশা। বিল্ডিংটি কয় তলা হবে, প্রতি তলায়
কয়টি কামরা হবে; বাথরুম, কিচেন, বারান্দার অবস্থান
কোথায় হবে, সিঁড়ি কোথায় হবে, পার্কিং সুবিধা
থাকবে কি না, থাকলে কতগুলো পার্কিং থাকবে
এবং সর্বোপরি বিল্ডিংয়ের বাহ্যিক ও
অভ্যন্তরীণ তথা নান্দনিক সৌন্দর্য কেমন
হবে- এ বিষয়গুলো একজন স্থপতি নির্ধারণ করে
থাকেন।
এরপর আসে স্ট্রাকচারাল ডিজাইনের কাজ। একজন
সিভিল ইঞ্জিনিয়ার, যিনি স্ট্রাকচারাল ডিজাইনের কাজে
যথেষ্ট অভিজ্ঞ- স্থপতির করা নকশা নিয়ে ডিজাইন
করা শুরু করবেন। কংক্রিটের শক্তিমাত্রা কত হবে,
স্লাবের পুরুত্ব কত হবে, স্লাবের ভেতরে
কী পরিমাণ রড দিতে হবে, বিম-কলামের আকৃতি
কেমন হবে, বিম-কলামের ভেতরে কী
পরিমাণ রড দিতে হবে, ফাউন্ডেশন কেমন
হবে, পাইলিং লাগবে কি লাগবে না- এ বিষয়গুলো
একজন স্ট্রাকচারাল ইঞ্জিনিয়ার নির্ধারণ করবেন।
পাশাপাশি বাতাসের চাপ এবং ভূমিকম্প প্রতিরোধ
ব্যবস্থায় ভবনটি কতটা সক্ষম, এ বিষয়টিও স্ট্রাকচারাল
ডিজাইনের অন্তর্ভুক্ত।
ভবনের প্রকৌশলগত কিছু বিষয় নিয়ে কথা বলা
দরকার। প্রথমেই দেখতে হবে যে ওই
জায়গার মাটি পরীক্ষা করা হয়েছে কি না। না হয়ে
থাকলে মাটি পরীক্ষা করাতে হবে। আর
হয়ে থাকলে রিপোর্টটি সংগ্রহ করে তারপর
ডিজাইনের কাজ শুরু করতে হবে। ডিজাইনের
আগে যে বিষয়টি অবশ্যই জেনে নেওয়া
দরকার, তা হলো কর্তৃপক্ষ কত তলা পর্যন্ত
অনুমোদন দিয়েছে এবং ভবনটির ব্যবহার কী
ধরনের হবে। অর্থাৎ ভবনটি কি শুধুই আবাসিক ভবন
হবে, নাকি ভবিষ্যতে এটি স্কুল, কলেজ, হাসপাতাল,
মার্কেট বা কারখানার গুদাম হিসেবেও ব্যবহৃত
হবে- এ বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কেননা, প্রায়ই
দেখা যায় আবাসিক হিসেবে নির্মিত ভবনটি
অন্যভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে। রানা প্লাজা ধসের
ঘটনায়ও এ বিষয়টি অনেকাংশে দায়ী। ভবনটি
বাণিজ্যিকভাবে ব্যবহারের জন্য তৈরি করা হলেও
এখানে বেশ কিছু গার্মেন্ট কারখানা ছিল এবং এর
ফলে প্রচুর লোক সমাগম হতো। এখানে
অনেক ভারী যন্ত্রপাতি রাখা হয়েছিল,
যেগুলোর ভার বহন করার সামর্থ্য ভবনটির ছিল না।
কাজেই ভবন মালিকদের এ বিষয়টি অবগত থাকা
প্রয়োজন যে তাঁর ভবনটি প্রকৃতপক্ষে
কিভাবে ব্যবহারের জন্য নির্মাণ করা হয়েছে এবং
অতিরিক্ত ভাড়া পাওয়ার আশায় তিনি যেন সেটিকে
অন্যভাবে ব্যবহার না করেন।
ভবন নির্মাণের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত
প্রতিটি ক্ষেত্রে কংক্রিটের মান নিয়ন্ত্রণ করা
অত্যন্ত জরুরি। কারণ এটি হলো ভবন নির্মাণের
সবচেয়ে জটিল একটি উপাদান, যার চরিত্র অনিশ্চয়তায়
পূর্ণ। কাজেই নির্মাণকাজের প্রতিটি ধাপে
কংক্রিটের মান বজায় রাখা অপরিহার্য। হিসাব করে
দেখা গেছে যে একটি কলামের বেলায়
কংক্রিট শতকরা প্রায় ৬০ থেকে ৭০ ভাগ ভার
নিয়ে থাকে। অন্যদিকে কংক্রিটের মাঝে
স্টিলের রডগুলো সঠিকভাবে প্রোথিত
থাকলে বাকি ৩০ থেকে ৪০ ভাগ ভার রডগুলো
বহন করতে সক্ষম হয়। অতএব বলা যেতে
পারে, আরসিসি ভবনের বেলায় গরিষ্ঠভাগ ভার
কংক্রিটই নিয়ে থাকে। সুতরাং কংক্রিটের মান
নিয়ন্ত্রণ করা অত্যাবশ্যক। কংক্রিটে সিমেন্ট, বালু,
খোয়া এবং পানির অনুপাত কেমন হবে, তা
স্ট্রাকচারাল ইঞ্জিনিয়ার নির্ধারণ করে দেবেন এবং
সাইটে এই অনুপাত মেনে কংক্রিট বানানো
হচ্ছে কি না ও ঢালাইয়ের সময় সূক্ষ্ম
ভুলত্রুটিগুলো এড়ানো সম্ভব হচ্ছে কি না তা
যথাযথভাবে লক্ষ রাখতে হবে। ঢালাই করার পর
কংক্রিট অবশ্যই সঠিকভাবে কমপ্যাক্ট করতে
হবে। সে ক্ষেত্রে ভাইব্রেটর ব্যবহার
করলে ভালো ফল পাওয়া যায়। এ ছাড়া কংক্রিট
ঢালাইয়ের পর তা একটি নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত পানি
দিয়ে ভিজিয়ে রাখতে হয়। এটাকে
প্রকৌশলগত পরিভাষায় বলা হয় কিউরিং করা।
এগুলো প্রতিটি বিষয় কংক্রিটের পূর্ণ শক্তি
অর্জনের জন্য অত্যাবশ্যক। আমাদের দেশে
যেসব সিমেন্ট প্রস্তুত হয়, তা অত্যন্ত গুণগত
মানসম্পন্ন। এসব সিমেন্ট দিয়ে অনায়াসে তিন
হাজার পিএসআই থেকে শুরু করে ৪৫০০
পিএসআই শক্তিমাত্রার কংক্রিট প্রস্তুত করা সম্ভব।
বাংলাদেশে প্রস্তুতকৃত রডও অত্যন্ত
উচ্চমানসম্পন্ন। কাজেই রডের ব্যাপারেও খুব
বেশি কিছু বলার সুযোগ নেই। তবে রড
ঠিকমতো বাঁধা হচ্ছে কি না, বিমের রডগুলো
সঠিকভাবে এবং নির্দেশিত জায়গায় কাটা হচ্ছে কি না,
যেসব জায়গায় রড বাঁকানো হয়ে থাকে,
সেসব জায়গায় ঠিকমতো বাঁকিয়ে স্থান করা
হচ্ছে কি না এবং কংক্রিটের বাইরের পৃষ্ঠ
থেকে রডের সঠিক ক্লিয়ার কভার বজায় থাকছে
কি না, এ বিষয়গুলো অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে
লক্ষ রাখা প্রয়োজন। মনে রাখতে হবে, শুধু
কংক্রিট দিয়ে যেমন ভবন নির্মিত হয় না, ঠিক তেমনি
শুধু রড দিয়ে ভবনের স্থায়িত্ব বাড়ানো যায় না।
এই দুটো পদার্থের সঠিক এবং নিয়মতান্ত্রিক
সমন্বয়ের মাধ্যমেই কেবল একটি মানসম্মত
নির্মাণকাজ সম্ভব হতে পারে।

إرسال تعليق

Post a Comment (0)

أحدث أقدم